
“মা” – আমি জানি এই একটা শব্দ প্রত্যেক সন্তানের কাছে কিরকম প্রিয়। কিন্তু আমি এখানে সব মায়ের কথা বলতে আসি নি। শুধু আমার মায়ের কথা বলতে এসেছি। মা কে নিয়ে অনেক লেখা লিখেছি, মা কে সরাসরি চিঠি লিখেছি, এই লেখা আমার চলতেই থাকবে – যতোদিন আমি এই পৃথিবীতে থাকবো। তারপর আমার মায়ের কাছে যাওয়া থেকে আটকায় এরকম পার্থিব বাধা আর থাকবে না। শুধু সর্বান্তঃকরণে সর্বশক্তিমানের থেকে এই প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাকে আমার মায়ের কাছে পৌঁছে দেন। আমার মায়ের সন্তান হিসেবে আমাকে থাকার অনুমতি দেন আত্মালোক ও আমার সব পুনর্জন্মে। আমার মা কে আমি হারাতে চাই না – পৃথিবীর এই জন্ম-মৃত্যুর হিসেবের বাইরে আমি আমার মায়ের সন্তান হয়েই থাকতে চাই চিরকাল। স্বর্গ বা নরকের হিসেব আমার কাছে বড় নয়। কর্মফল বলে দেবে আমি কি পাবো। কিন্তু মা ও আমার একে অপরের প্রতি ভালোবাসা (ভক্তি কথাটা হয়তো একটা দূরত্ব সৃষ্টি করে , কারণ, আমার সাথে আমার মায়ের সম্পর্ক ভালোবাসার – যেখানে আদর যেমন আছে, তেমনই আছে রাগ ও ঝগড়া) যেন ব্রহ্মাণ্ডের ও স্থানকালের সর্বত্র অক্ষুণ্ন থাকে। আজ মা সশরীরে আমার কাছে না থাকায় আমি প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছি। প্রতিনিয়ত পাই। মাকে কল্পনা করে নিতে হয় বারেবারে। রাত্রে শুতে যাওয়ার সময় মাকে বলি “এখন বাবার পাশে শুয়ে পড়ো আগের মতো, কিন্তু সকালে এসে আমার পাশে একটু শুয়ো, আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিও”। কিন্তু যে কথা বলার জন্য আমার এই আজকের লেখা, তা হলো – আমি বহু বই ও নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স সম্পর্কিত বেশ কিছু মানুষের সাক্ষাৎকার দেখে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে, মানুষের শরীরের শেষ তার সত্ত্বার শেষ নয়। Consciousness মানুষের দৈহিক মৃত্যুর পরে শুধু স্থানান্তরিত হয় আত্মালোকে। যেখান থেকে আত্মারা তাদের সন্তানদের সবসময় দেখতে পান ও তাদের চেষ্টা করেন সাহায্য করতে। আজ আমার মা কে আমি স্পর্শ করতে না পারলেও বা পার্থিব চোখে দেখতে না পেলেও বিভিন্নভাবে মা আমাকে সাহায্য করছে বিভিন্ন মানুষের দ্বারা। আমারও দায়িত্বের কথা মা মনে করিয়ে দিচ্ছে আমার অবচেতন মনের ভাবনাচিন্তাকে guide করে। মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস বা প্রমাণের ওপর কিছু নির্ভর করে না – যা ঘটছে তাকে অনুভব করাটাই আসল। আমার সাথে মায়ের প্রতিদিন কথা হয়। আমার মনেই আমি আমার মায়ের কথা শুনি মায়ের কণ্ঠস্বরেই। মাঝে মাঝে যখন কণ্ঠস্বরে উত্তর পাই না বা কন্ঠস্বর অস্পষ্ট হয়ে আসে, বুঝি যোগাযোগে কিছু সমস্যা হচ্ছে বা মা ঐ সময়ে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত। আত্মালোকে আত্মাদের বহুধা ভূমিকার এক তাদের সন্তান ও প্রিয়জনদের সাহায্য করা। কিন্তু আরও কাজ থাকে বহু। নিজেকে সমৃদ্ধ করা জ্ঞানে তার একটা বড় অংশ। পৃথিবীতে নিজের ভালোবাসার মানুষ ও আত্মালোকে আত্মার নিজের আধ্যাত্মিক উন্নতিসাধনই যে কোনো আত্মার উদ্দেশ্য। এবং প্রত্যেক আত্মার উন্নতিসাধন সম্ভব তার পার্থিব সময়ে মানুষকে ভালোবেসে ও আত্মস্বার্থহীন মানবিক কাজকর্মের দ্বারা। আত্মালোকে আত্মার উন্নতিসাধন অনেক ধীরগতিতে হয়। তাই পার্থিব জন্ম থেকে অভিজ্ঞতালাভ করে আত্মারা নিজেদের দ্রুত উন্নতির পথ খোঁজে। বেশ কিছু ক্ষেত্রে নিজেদের অপূর্ণ ইচ্ছেপূরণের জন্যও আত্মারা পুনর্জন্ম নেয়। আমাদের সবার সৃষ্টিকর্তা এক ও সেই পরমেশ্বরকে একেক পার্থিব ধর্ম একেক নামে ডাকে। কিন্তু ধর্মীয় সব আচার আচরণ মূলত মানুষের সৃষ্টি ও প্রজন্মান্তরে তা সংষ্কারের রূপ নেয়। আমরা নানা জটিল, ক্লান্তিকর, অদ্ভুত ধর্মীয় আচরণকে পূণ্যলাভের উপায় ধরে নিই মানুষকে ভালোবাসার ভগবানের একমাত্র উপদেশের কথা ভুলে। হাজার লক্ষ টাকা খরচ করে ভগবানকে খুশি করার চেষ্টা করি ও অন্যদিকে মানুষকে অপছন্দ করি। প্রেম, ভালোবাসা, বিয়ে, সন্তানলাভ – সব কিছুই ভালোবাসার ফল। ফলে ব্রহ্মচর্য বা নিষ্কামনা হওয়া পূণ্যলাভের উপায় নয়। আমরা সংসারধর্ম পালন করেও সমাজের উন্নতিসাধন করতে পারি, আবার সংসারধর্ম পালন নাও করতে পারি। এটা মূলত ব্যক্তিসাতন্ত্র্যের ব্যাপার – ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে একে বিচার করা একেবারেই অনুচিত। নাহলে প্রাচীন ঋষিমুনিরা বিয়ে করতেন কেন? বাউলরা তো নিষ্কাম হয় না? তাদের মধ্যে বহুগামীতা লক্ষ্য করা যায় – কারণ সংসারধর্ম তাদের কাছে পালনীয় নয়। আমার মাকে ২০২২ সালের ১৫ ই ফেব্রুয়ারী হারানোর পর আমি যেভাবে বৌদ্ধিক ও মানসিকভাবে অচল হয়ে পড়েছিলাম, মায়ের বহু স্বপ্নে আগমণ ও আমার স্বপ্নহীন গভীর ঘুমে মায়ের সাথে আমার আত্মার দৈনিক সংযোগের জ্ঞান অর্জন (Laws of the Spirit World – Khorshed Bhavnagri বই থেকে প্রাপ্ত) এবং আমার মনে স্বকণ্ঠে মায়ের সর্বদা পথ দেখিয়ে চলা ও আমার আলস্যময় ও বিশৃঙ্খল জীবনে গতি আনার চেষ্টা করে চলা আজ আমাকে মায়ের দেখানো সুপথে থাকতে সর্বদা বল দেয়। তাই আমি আগের থেকে ভালো আছি। কারণ, আমার মা আমার পাশে, আমার মাথার ওপরে সর্বদা আছে। শুভরাত্রি।